সোনম ওয়াংচুক: জীবন, কাজ ও সাম্প্রতিক অনশন-আন্দোলনের সম্পূর্ণ বিবরণ
লাদাখের প্রকৌশলী-সমাজকর্মী থেকে ভারতের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ — তাঁর কাজ, লাদাখ আন্দোলনের ইতিহাস এবং ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অনশন নিয়ে বিস্তারিত।
এই ব্লগে যা থাকছে
সোনম ওয়াংচুক কে?
সোনম ওয়াংচুক লাদাখের একজন প্রকৌশলী, শিক্ষা সংস্কারক এবং পরিবেশ কর্মী। ছোটবেলায় তিনি শ্রীনগরে পড়াশোনা করেছিলেন, যেখানে হিন্দি ও ইংরেজিতে দুর্বল হওয়ার কারণে তাঁকে সহপাঠীদের বিদ্রুপের শিকার হতে হয়েছিল বলে তিনি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীতে তিনি লাদাখের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে মনোনিবেশ করেন।
১৯৮৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন SECMOL (Students' Educational and Cultural Movement of Ladakh) — যেটি লাদাখের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলা একটি বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৪ সালে তিনি সরকার, গ্রামীণ সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের যৌথ উদ্যোগ 'অপারেশন নিউ হোপ'-এরও উদ্যোক্তা ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল সরকারি স্কুল ব্যবস্থায় সংস্কার আনা।
বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা থ্রি ইডিয়টস (২০০৯)-এর ফুনসুখ ওয়াংড়ু চরিত্রটি তাঁর জীবন থেকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়, যদিও এই বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।
SECMOL, আইস স্তুপা ও অন্যান্য উদ্ভাবন
সোনম ওয়াংচুকের পরিচিতির একটি বড় অংশ তাঁর প্রযুক্তিগত ও স্থাপত্য-সংক্রান্ত উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িত।
- তাঁর ডিজাইন করা SECMOL ক্যাম্পাস সম্পূর্ণভাবে সৌরশক্তিতে চলে — রান্না, আলো ও গরম রাখার জন্য কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয় না।
- তিনি 'আইস স্তুপা' প্রযুক্তির অন্যতম প্রবর্তক, যেখানে শীতকালে জমা করা বরফের কৃত্রিম শঙ্কু গ্রীষ্মকালে গলে কৃষিকাজে জলের যোগান দেয় — লাদাখের মতো শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে স্বীকৃত।
- শিক্ষা, পরিবেশ ও টেকসই স্থাপত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে রামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এবং রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড ফর এন্টারপ্রাইজ পেয়েছেন।
লাদাখ আন্দোলনে তাঁর দীর্ঘ ভূমিকা
২০১৯ সাল থেকে সোনম ওয়াংচুক লাদাখের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে সরব — মূলত রাজ্যের মর্যাদা (স্টেটহুড) এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে (Sixth Schedule) অন্তর্ভুক্তির দাবিতে। Apex Body Leh ও Kargil Democratic Alliance-এর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি একাধিকবার অনশন আন্দোলন করেছেন।
- জানুয়ারি ২০২৩: ষষ্ঠ তফসিলের দাবিতে পাঁচ দিনের 'জলবায়ু অনশন' ঘোষণা করেন।
- মার্চ ২০২৪: লেহ-তে ২১ দিনের 'ক্লাইমেট ফাস্ট' পালন করেন, যাতে লাদাখের রাজ্যের মর্যাদার দাবিও যুক্ত হয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২৪: শতাধিক সমর্থক নিয়ে লাদাখ থেকে দিল্লি পর্যন্ত প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করেন এবং দিল্লিতে ফের অনশনে বসেন।
- সেপ্টেম্বর ২০২৫: আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর লেহ-তে ৩৫ দিনের অনশন কর্মসূচি শুরু হয়, যাতে তিনিও যোগ দেন। পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠায় তাঁকে জাতীয় সুরক্ষা আইনে (NSA) আটক করা হয়।
- মার্চ ২০২৬: NSA-এর আদেশ প্রত্যাহারের পর তিনি মুক্তি পান এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু হয়।
২০২৬ সালের অনশনটি কী নিয়ে ছিল?
২০২৬ সালের জুন মাসে ভারতের একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার জেরে দিল্লির জান্তার মান্তারে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে অনশনে বসেন। সংহতি জানিয়ে সোনম ওয়াংচুকও ২৮ জুন থেকে সেই প্রতিবাদস্থলে যোগ দিয়ে অনশন শুরু করেন।
ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে এগিয়েছে
অনশন কীভাবে শেষ হলো?
সোনম ওয়াংচুক এক্স (X)-এ জানান, দেশে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা এবং নানা শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি অনশন প্রত্যাহার করেছেন। মেদান্তা হাসপাতালে মন্ত্রী জে পি নাড্ডা তাঁকে হাতে করে স্যুপ খাইয়ে দেন বলে ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে। এর কিছুক্ষণ আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স-এ ভিডিও বার্তায় জানান, প্রশ্নফাঁস রুখতে কড়া আইন আনা হবে এবং এই বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
- সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সোনম ওয়াংচুকের গণতন্ত্র ও পরিবেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রশংসা করে বার্তা দেন।
- CJP প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে তাঁর ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
- সরকারপক্ষ জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
- আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
সোনম ওয়াংচুক কেন বিখ্যাত?
তিনি লাদাখের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন SECMOL প্রতিষ্ঠা, আইস স্তুপা প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সৌরশক্তিনির্ভর টেকসই স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এছাড়া লাদাখের রাজ্যের মর্যাদা ও পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে একাধিক অনশন আন্দোলনেও তিনি অংশ নিয়েছেন।
তিনি এর আগেও কি অনশন করেছেন?
হ্যাঁ। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি একাধিকবার অনশন করেছেন — যার মধ্যে ২০২৪ সালের ২১ দিনের 'ক্লাইমেট ফাস্ট' এবং ২০২৫ সালের ৩৫ দিনের অনশন কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য, যেখানে তাঁকে জাতীয় সুরক্ষা আইনে আটকও করা হয়েছিল।
২০২৬ সালের অনশনটি কী নিয়ে ছিল?
এটি ছিল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে করা অনশন।
অনশন কতদিন চলেছিল?
মোট ২৬ দিন ধরে অনশন চলার পর তিনি তা প্রত্যাহার করেন।
0 Comments
Thank you for contacting jibonta.in! Please let us know how we can help you.