Head add

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ - সাহিত্যের উদ্দেশ্য - সংক্ষিপ্ত,রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

 

রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য

সাহিত্যের উদ্দেশ্য

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ কত সালে রচিত হয় ?

  • উত্তর।‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধটি  ১২৯৪ বঙ্গাব্দে বৈশাখ মাসে  রচিত হয়। 

প্রশ্ন ২। 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধটি  কোন পত্রিকার কোন সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ পায় ? 

  • উত্তর। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ ‘ভারতী ও বালক' পত্রিকায় ১২৯৪ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়।

প্রশ্ন ৩। বঙ্গভাষার সাহিত্য সমালোচকেরা লেখা পেলেই কী করেন?

  • উত্তর। সাহিত্য সমালোচকেরা লেখা পেলেই তার মধ্যে থেকে “উদ্দেশ্য বাহির করিতে” চেষ্টা করেন। 

প্রশ্ন ৪। সমালোচকেরা সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য খুঁজতে চান কেন? 

  • উত্তর। রবীন্দ্রনাথ উপহাস করে বলেছেন, সমালোচকেরা লেখার মধ্যে একটা উদ্দেশ্য ধরতে না পারলে লিখে সুখ পান না

প্রশ্ন ৫। “ছাত্রের মুণ্ডিত মস্তক তাঁহার পক্ষে অত্যন্ত শোকের কারণ হয়।”—কোন রচনার অংশ? শোকের কারণ কী?

  •  উত্তর। “ছাত্রের মুণ্ডিত মস্তক তাঁহার পক্ষে অত্যন্ত শোকের কারণ হয়।"—উদ্ধৃতাংশটি রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য' গ্রন্থের অন্তর্গত ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধের অংশ। 
  • যে শিক্ষক ছাত্রের ঝুটি ধ'রে মারেন, তাঁর সামনে ছাত্র মুণ্ডিত মস্তকে এলে তো শোক হবেই।

প্রশ্ন ৬। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ঐতিহাসিক রচনাকে কখন সাহিত্য ব'লে মানা যায় ? 

  • উত্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - ঐতিহাসিক রচনার ঐতিহাসিক অংশটুকু অসত্য বলে প্রমাণ হলেও তা যদি মানুষের দ্বারা আদৃত হয়, তাহলে তাকে সাহিত্য ব’লে  মানা যায়।

প্রশ্ন ৭।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “কোনো-একটা বিশেষ ঘটনা বর্ণনা যাহার উদ্দেশ্য,” তাকে কী বলা হয়?

  • উত্তর।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “কোনো একটা বিশেষ ঘটনা বর্ণনা যাহার উদ্দেশ্য," তাকে বলা হয় ইতিহাস

প্রশ্ন ৮। কোন্ শ্রেণীর রচনার ক্ষেত্রে  কোনো উদ্দেশ্য থাকা জরুরী নয়?

  • উত্তর। সাহিত্যে রচনার ক্ষেত্রে কোনো উদ্দেশ্য থাকা জরুরী নয়।

প্রশ্ন ৯। সৃষ্টি আর নির্মাণের মধ্যে পার্থক্য কী?

  •  উত্তর। সৃষ্টির কোনো উদ্দেশ্য থাকে না; 
  • কিন্তু নির্মাণের উদ্দেশ্যের পরিচয় সহজেই জানা যায়।

প্রশ্ন ১০। সাহিত্য ও দর্শনের পার্থক্য কী?

  • উত্তর। সাহিত্য সৃজনধর্মী, দর্শন - বিজ্ঞান নির্মাণধর্মী। 
  • সাহিত্যের উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু দর্শন-বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য আছে।

প্রশ্ন ১১।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “বন্ধুতে বন্ধুতে মিলন হইলে আমরা কত বাজে কথাই বলিয়া থাকি।”—‘বাজে কথা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? 

  • উত্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ‘বাজে কথা’ হ’ল সেই সব কথা, যার উদ্দেশ্য নেই, যা যুক্তি গ্রাহ্য নয়।

প্রশ্ন ১২।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে 'বাজে কথা'র দ্বারা কী কী হ'তে পারে?

  • উত্তর।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - ‘বাজে কথা’র দ্বারা হাসি, আনন্দ, চিত্তের বিকাশ ইত্যাদি হ’তেই পারে। 

প্রশ্ন ১৩।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সব সময় উদ্দেশ্য বা বিষয় জ্ঞানের কথা মাথায় রেখে কাজ করলে আমরা কী কী হারাতে পারি ? 

  • উত্তর।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সব সময় উদ্দেশ্য বুঝে কাজ করলে আমরা জীবন থেকে কৌতুকরস, প্রেম, আনন্দ ইত্যাদিকে হারাবো।

প্রশ্ন  ১৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সকলেই যদি বিষয়ী লোকের মতো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে, তাহ'লে চারিদিকে আমরা কী দেখতে পাবো? 
  • উত্তর।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সবাই বিষয়ী লোকের মতো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে তাহলে,আমরা চারিদিকে দেখতে পাবো শুষ্কদেহ, লম্বমুখ, শীর্ণগণ্ড, উচ্চ হনু, হাস্যহীন ওষ্ঠাধর, কোটর প্রবিষ্ট চক্ষু বিশিষ্ট মানুষ। 

প্রশ্ন ১৫। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সাহিত্য সৃষ্টির কারণ ও উদ্দেশ্য কী? 
  • উত্তর। রবীন্দ্রনাথের মতে আনন্দই সাহিত্য সৃষ্টির কারণ এবং আনন্দই তার উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন ১৬।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সাহিত্যের প্রভাবে মানবসমাজে কী কী ভালো কাজ হয়ে থাকে? 
  • উত্তর।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - সাহিত্যের প্রভাবে মানব সমাজে হৃদয়ে হৃদয় যোগ করা সম্ভব হয়। হৃদয়ের জীবন ও স্বাস্থ্য সঞ্চার হয়।
প্রশ্ন ১৭। 'সাহিত্য' শব্দটির তাৎপর্যগত অর্থ লেখ।
  •  উত্তর। ‘সাহিত্য’ শব্দের মধ্যে 'সহিত' কথাটি বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। 
  • সাহিত্য হল - সঙ্গে থাকবার ভাব। 
  • মানুষকে স্পর্শ করার ভাব। 
  • অনুভব করার ভাব। 
প্রশ্ন ১৮।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য বলিয়া যাহা হাতে ঠেকে,” কথাটির তাৎপর্যগত অর্থ লেখ?
  • উত্তর।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে - "বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য বলে যা হাতে ঠেকে,'' অর্থাৎ মনে হয়, তা ‘আনুষঙ্গিক’। তা প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। 
প্রশ্ন ১৯। “মৎস নামধারী উক্ত কীট বিশেষ সকল হিসেবেই সুবিধাজনক।”—কীট বলা হয়েছে কাকে? কোন প্রসঙ্গে এই কথা বলেছেন?
  • উত্তর। “মৎস নামধারী উক্ত কীট, '—এখানে কীট বলা হয়েছে চিংড়িমাছকে। 
  • সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য হাতড়াতে গেলে হাতে কী কী উঠতে পারে, তার আভাস দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (লেখোক) গঙ্গা আর তার অভ্যন্তরে থাকা চিংড়িমাছের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।
প্রশ্ন ২০। 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধের বক্তব্য স্পষ্ট করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ মোট কয়টি উপমান বা দৃষ্টান্তকে প্রবন্ধে টেনে এনেছেন?
  • উত্তর। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধের বক্তব্য স্পষ্ট করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ মোট ছয়টি উপমান বা দৃষ্টান্তকে প্রবন্ধে টেনে এনেছেন; যথা — 
  1. অস্ত্র এবং প্রাণনাশ, 
  2. শিক্ষক এবং ঝুঁটিওয়ালা ছাত্র, 
  3. গঙ্গা এবং চিংড়িমাছ, 
  4. ফুলফোটা এবং ইটের পাঁজা পোড়া বা সুরকির কল চলা, 
  5. সন্দেশ মুখে পোরা, 
  6. পলিতকেশ বৃদ্ধদের কাণ্ড ইত্যাদি।

সংক্ষিপ্ত রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১।“অতএব বিষয়ী সমালোচকের পক্ষে মৎস নামধারী উক্ত কীট বিশেষ সকল হিসাবেই সুবিধাজনক।”—উদ্ধৃতাংশটি কোন্ রচনা থেকে নেওয়া? এই কথাটির প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য আলোচনা করো।

  • উত্তর। “অতএব বিষয়ী সমালোচকের পক্ষে মৎস নামধারী....”
—এই উদ্ধৃতাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধ থেকে নেওয়া।

প্রকৃত সাহিত্যের মধ্যে কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু এক শ্রেণীর সমালোচক উদ্দেশ্য না  পেলে সন্তুষ্ট হন না। তাঁরা সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য হাতড়াতে থাকেন। তাঁদের প্রচেষ্টা এবং তার পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়েই লেখক এই মন্তব্যটি করেছেন। 

যথার্থ সাহিত্যের মধ্যে বিষয় হাতড়ানো, আর গঙ্গার মধ্যে থেকে সৌন্দর্য আলাদা করে পাওয়া যায় না। পদ্মার তরঙ্গের উপর সূর্যালোক চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যখন চোখে আসে, তখন, সেই পরিবেশে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেই হয়। কেউ যদি মনে করেন, তাঁর গঙ্গা চায় না, প্রবাহ চায় না, ভরণা চায় না, শুধু বিষয় চায়; আলাদা আলাদা ভাবে প্রবাহ চায়, তরা চায়, সূর্যালোক চুপ চাষ।

 তিনি কোনোটাই পাবেন না। জেদ করে, শ্রম স্বীকার করে ঘড়া ঘড়া জল তুলে চুল্লির উপর বসালে কী পাওয়া যেতে পারে? –কেবল বাষ্প আর পঙ্ক। তার সঙ্গে আরো যদি কিছু মেলে তবে সে চিংড়ি মাছ। গঙ্গার সৌন্দর্য, প্রবাহ, তরশমালা, তাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ আলোক, শাস্ত সমাহিত ভাব, কলধ্বনি—যাতে মানুষ মুগ্ধ হতে পারেন, চমৎকৃত হতে পারেন, সেসব কিছুই মিলবে না। 

ধীবরের (জেলে) পক্ষে হতে পারে চিংড়িমাছ লাভজনক, কিন্তু বিষয়ীর তাতে কতটা লাভ? সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যদি কেউ বিষয় খুঁজতে গিয়ে সাহিত্যকেই কাটা ছেঁড়া করেন, ভাঙচুর করেন, তাঁর কপালেও পাঁঝই জুটবে, সৌন্দর্য আর আনন্দ তাঁর কপালে জুটবে না। লেখক গঙ্গার উপমা ব্যবহার করে বিষয়টিকে যেভাবে উপস্থাপিত করেছেন, তা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সার্থক হয়েছে।

প্রশ্ন ২। “উদ্দেশ্য না থাকিয়া সাহিত্যে এইরূপ সহস্র উদ্দেশ্য সাধিত হয়।"-কে কোন রচনা৷ এই মন্তব্য করেছেন? এর তাৎপর্য আলোচনা করো।

  •  উত্তর। উদ্দেশ্য না থাকিয়া সাহিত্যে এইবুপ সহস্র উদ্দেশ্য সাধিত হয়।"

—এই মন্তব্যটি রবীন্দ্রনাথ করেছেন তাঁর সাহিত্যের উদ্দেশ্য' রচনায়।

⇒ উৎকৃষ্ট সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। তার মধ্যে উদ্দেশ্য হাতড়াতে যাওয়া ভ্রান্তি। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদির মতো রচনায় উদ্দেশ্য বা বিষয় থাকে; কিন্তু সাহিত্যে তেমনটা থাকে না। কারণ, সৃষ্টিতে কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, থাকে নির্মাণেরসাহিত্য হল সৃষ্টি

 তবু যাঁরা সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য হাতড়াতে চান, তারা লাভের বিষয় অবশ্যই কিছু না কিছু পান। প্রথমেই বলা যায় আনন্দের কথা। সাহিত্যের প্রভাবে বিভিন্ন মানুষের হৃদয়ের যোগাযোগ হয়। হৃদয়ে হৃদয় যোগ করা, অপরের ভাবের কথা জানতে পারা, নিজের অন্যকে জানানো এ সবের মধ্যে এক প্রকার আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে। একসঙ্গে থাকার আনন্দ। জগতে এমন কত কিছু আছে, যা কেবল আনন্দ দেবার জন্যই। 

বাতাসের প্রবাহ, ঋতুচক্রের ফিরে ফিরে আসা, ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভর করে ভেসে যাওয়া, পাখির গান গাওয়া, প্রকৃতিতে রূপের বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করা—এসব তো মানুষের পক্ষে অবাঞ্ছিত নয়। প্রকৃতির মধ্যে এমন সব প্রাপ্তিযোগ ঘটলে আমরা খুশি হই। সাহিত্যের মধ্যেও এমন কতকিছু আমরা পাই, যার নিটফল আনন্দ। আনন্দ পেতে কার না ইচ্ছা থাকে। অসংখ্য রকমের আনন্দের অনুভূতিই বলতে গেলে সাহিত্যের উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন ৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “বন্ধুতে বন্ধুতে মিলন হইলে আমরা কত বাজে(Bad)_ কথাই বলিয়া থাকি। তাহাতে করিয়া হৃদয়ের কেমন বিকাশ হয়।"-বাজে কথা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? রবীন্দ্রনাথ তাকে সমর্থন করেছেন কেন?

উত্তর। “বন্ধুতে বন্ধুতে মিলন হইলে আমরা কত বাজে(Bad)_কথাই বলিয়া থাকি।"
 — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে বাজে কথা বলতে বুঝিয়েছেন হয়েছে সেইসব কথাকে, যা অর্থবহ নয়, যা যুক্তি নির্ভর নয়, পূর্বাপর সম্পর্কযুক্ত নয়, যার মাধ্যমে জ্ঞান, বিদ্যা বা অর্থ লাভ হয় না; বিষয়ী যে কথায় সময় নষ্ট হল মনে করেন।

মিলন হলে সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য নেই। জ্ঞান-বিদ্যার প্রসার ঘটাতে বা অর্থ লাভের আশাতে সাহিত্য চর্চা কেউ করে না। সেদিক থেকে সাহিত্য এক অর্থে বাজে কথা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বাজে কথাকে সমর্থন করেন। বাজে কথাও মানুষকে অনেক কিছু দেয়। বন্ধুতে বন্ধুতে আবেগে উচ্ছ্বাসে, উত্তেজনায় তাদের মধ্যে যে সব কথা হয়, তাতে কেউই জ্ঞানে-মানে-ধনে সমৃদ্ধ হয় না। বরং, সেদিক থেকে কিছু লোকসান হয়। তবু বাজে কথা কাম্য। কারণ, এর মধ্যে দিয়ে বন্ধু প্রীতি বৃদ্ধি পায়, হৃদয়ের বিকাশ ঘটে, আনন্দ লাভ হয়, সামাজিকতাও রক্ষিত হয়। এগুলোর কোনোটাই উপেক্ষণীয় নয়। সমাজে সুস্থভাবে, খুশী মনে বাঁচতে গেলে এগুলোর দরকার হয়।

সাহিত্যও সামাজিক মানুষের এই চাহিদাগুলো পূরণ করে। মনে আনন্দ দেয়, হৃদয়ের বিকাশ ও প্রকাশ ঘটায়, মানুষে মানুষে সহাবস্থানের উপায় করে, বিচিত্র সব রসের আস্বাদন করিয়ে পাঠকদের পরিতৃপ্ত করে। তাই, রবীন্দ্রনাথ বাজেকথা আর সাহিত্যের মধ্যে মিল খুঁজে পান। নির্দোষ আনন্দের প্রয়োজনেই তিনি বাজে কথার সঙ্গে সাহিত্যকে সমর্থন করেছেন।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। “সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যা বলতে চেয়েছেন, তা নীয়ে টীকা লেখ।অথবা, “সৃষ্টির ন্যায় সাহিত্যই সাহিত্যের উদ্দেশ্য”— এ কথার তাৎপর্য অলোচনা করো।

উত্তর। রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য' গ্রন্থের অন্তর্গত একটি বিশিষ্ট প্রবন্ধ ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য। সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সে প্রসঙ্গে এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয় সন্ধানী মানুষ সব কিছুর মধ্যেই বিষয়ের সন্ধান করে থাকেন। সাহিত্যের মধ্যেও তারা বিষয় বা সারবস্তু খুঁজে ফেরেন। কিন্তু, প্রকৃত সাহিত্যের মধ্যে বিষয় থাকবেই, এমন কথা নেই। সাহিত্যের মধ্যে আলাদা করে বিষয় কিম্বা উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা, আর প্রবহমান জাহ্নবীর জলে আলাদা করে তরঙ্গ খোঁজা একই রকম পণ্ডশ্রম।

বিশুদ্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য আছে বলে যা মনে হয়, তা আনুষঙ্গিক এবং নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। যে রচনার স্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে, যে রচনা কোনো তত্ত্ব বা বিশেষ বিষয় সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করতে চায়, তাকে বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস নামে চিহ্নিত করা যায়। বিশুদ্ধ সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। সাহিত্য হ’ল সৃষ্টি ; সৃষ্টির কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। নির্মাণের উদ্দেশ্য থাকে। ফুল কেন ফোটে,—এ প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। কিন্তু ইটের পাঁজা কেন পোড়ে, সুরকির কল কেন চলে, তা’ সকলেই জানে। সাহিত্য সৃজনধর্মী। সাহিত্যই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।

সাহিত্যের যদি কোনো উদ্দেশ্য নাই থাকে, তাহলে সাহিত্য পাঠে লাভ কী? এমন প্রশ্ন কারো  মাথায় আসতে পারে, কিন্তু এর উত্তর দেওয়া সহজ নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, সাহিত্য পাঠে এক অনির্বচনীয় আনন্দের আস্বাদন হয়। “সাহিত্যের প্রভাবে আমরা হৃদয়ের দ্বারা হৃদয়ের যোগ অনুভব করি, হৃদয়ের প্রবাহ রক্ষা হয়, হৃদয়ের সহিত হৃদয় খেলাইতে থাকে, হৃদয়ে জীবন ও স্বাস্থ্য-সঞার হয়।" সাহিত্য মানেই হ’ল একত্রে থাকবার সঙ্গে থাকবার ভাব। মানবের ‘সহিত’ থাকবার ভাব। মানবকে স্পর্শ করা, অনুভব করার ব্যবস্থা করে সাহিত্য। উদ্দেশ্য না থাকলেও সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে এমন অনেক মহৎ কাজ সম্পন্ন হতেই পারে।

বন্ধুতে বন্ধুতে মিলন ঘটলে কত বাজে কথা হয় ; কত হাসি, কত আলাপ, কত আনন্দ! তার মধ্যে দিয়ে হৃদয়ের বিকাশও ঘটে। বিষয়ী লোকের অভিপ্রায় অনুসারে শুধু কাজের কথা নিয়ে পড়ে থাকলে হাস্যকৌতুক ও আনন্দের স্থান থাকতো না। তখন শুধু দেখতে পাওয়া যেত—‘শুষ্ক দেহ, লম্ব মুখ, শীর্ণ গণ্ড, উচ্চ হনু, হাস্যহীন শুষ্ক ওষ্ঠাধর, কোটর প্রবিষ্ট চক্ষু।”— সেটা আমাদের কারো কাম্য নয়।

সাহিত্যের অর্থই হল বাজে কথা। এখানে কাজের কথা, হিতের কথা, সমাজ কল্যাণের কথা থাকা আবশ্যই নয়। মেঘদূতের কবি কালিদাস তাঁর কাব্যে বাজে কথাই লিখেছেন। মেঘকে দেখে প্রিয়-বিরহে কাতর যে যক্ষ চেতন-অচেতনের পার্থক্য ভুলে মেঘকেই দূত ক'রে প্রিয়ার কাছে পাঠাতে চায়, তার কথায় সংসারের কোন প্রয়োজন সিদ্ধ হয়? কোন সমস্যার সমাধান হয়? অথচ, শ্রেষ্ঠ সাহিত্য এমনই। বহু শতাব্দী ধরে মানুষ তা পাঠ করে আসছে—কিসের জন্য? নিশ্চয় এক অহেতুক আনন্দের আস্বাদন করে তৃপ্ত হবার জন্য। সাহিত্য এরকমই বাজে কথা। তা হৃদয়ের বিকাশ ও স্ফূর্তির কারণ। তা আনন্দের উৎস। “আনন্দই তার আদি মধ্য অস্ত। আনন্দই তাহার কারণ এবং আনন্দই তাহার উদ্দেশ্য।”

প্রশ্ন ২। সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধে বক্তব্য স্পষ্ট করতে গিয়ে লেখক বেশ কিছু উপমান টেনে এনেছেন; তাদের প্রাসঙ্গিকতা ও সার্থকতা নিয়ে আলোচনা করো। 

উত্তর। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য' শীর্ষক রচনায় রবীন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছেন, যথার্থ সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। কিছু সমালোচক তাঁর রচনার মধ্যে ছুঁয়ে দেখার মতো কোনো বিষয় না পেয়ে বিরূপ সমালোচনা করেন। সাধারণ পাঠকেরা তাতে বিভ্রান্ত হতে পারেন ভেবেই সাহিত্য সম্পর্কিত কিছু সত্য এই প্রবন্ধে ব্যক্ত করেছেন। আর সেটা করতে গিয়েই বাস্তব সংসার থেকে, জীবনের পরিচিত বিষয় থেকে, কিন্তু উপমা সংগ্রহ করে, তারই সহায়তায় বক্তব্যকে পরিস্ফুট করেছেন।


লেখক প্রথমেই বলতে চেয়েছেন, “প্রকৃত সাহিত্যের মধ্য হইতে তাহার উদ্দেশ্যটুকু টানিয়া বাহির করা সহজ নহে।” আর এই সত্যটা স্পষ্ট করতে টেনে এনেছেন মানবদেহ ও প্রাণের উপমা। দেহে অবস্থিত প্রাণটাকে মারার জন্য নানাদেশে নানা অস্ত্র তৈরি হয়েছে; কিন্তু দেহ থেকে সেই প্রাণকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। সাহিত্যের উদ্দেশ্যকেও তেমনি আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না।।

সাহিত্য সমালোচকেরা তবু সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য ধরতে প্রয়াস চালিয়ে যান। তাকে ধরতে না পারলে তাঁরা স্বস্তি পান না। তাঁদের এই অস্বস্তির স্বরূপ বোঝাবার জন্যই তুলে ধরেছেন সেই শিক্ষকের কথা, যিনি ছাত্রদের ঝুঁটি ধরে মারেন এবং ছাত্রকে মুণ্ডিত মস্তক দেখলে শোকার্ত হন। সমালোচকদের কাছে সাহিত্যের উদ্দেশ্যটাই হল ঝুঁটি

সাহিত্য এবং তার উদ্দেশ্যের অভিন্নতা বোঝাবার জন্য এর পর টেনে আনা হয়েছে, গঙ্গার সৌন্দর্য, তার মহিমা, প্রবাহ, তরঙ্গভঙ্গ জনিত আলোক চূর্ণকে। গঙ্গা থেকে এগুলো যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি সাহিত্য থেকেও উদ্দেশ্যকে আলাদা করা যায় না। নির্দেশ করাও যায় না। যদি কেউ তা' করতে চান; তবে তিনি ঘড়া ঘড়া জল তুন্নেতে দিয়ে বাষ্প করে উড়িয়ে দিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর কপালে জুটবে বাষ্প আর পাঁক। আর পাঁকের মধ্যে থেকে কিছু চিংড়ি মাছও জুটতে পারে। কিন্তু গঙ্গার তরঙ্গ, তরঙ্গে চূর্ণ সূর্যালোকের সৌন্দর্য, কলধ্বনি—এসবের কোনোটাই আর পাওয়া যাবে না। এগুলো অনুভব করা যায়, ডাঙায় তুলে দেখানো যায় না। তেমনি, সাহিত্যের উদ্দেশ্য যে আনন্দ-রসের আস্বাদন, তা আলাদা করে দেখানো যায় না।

“সৃষ্টির উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, নির্মাণের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়।”—বক্তব্য সমর্থনের জন্য লেখক উল্লেখ করেছেন ফুল ফোটা এবং ইটের পাঁজা পোড়ার ও সুরকির কল চলার কথা। সত্যিই, ফুল কেন ফোটে—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। আর ইটের পাঁজা কেন পোড়ে-এর উত্তরে কোনো দ্বিমত নেই। এর পরও যদি কারো মনে প্রশ্ন থাকে, “যদি কোনো উদ্দেশ্য নাই তবে সাহিত্যে লাভ কী!” তাহলে তাঁকে বোঝানো যাবে না। সন্দেশ খেতে কেমন, এটা তাকে বোঝানো যায় না, তার মুখে সন্দেশ পুরে দিয়ে বুঝে নিতে বলা যায়, কিন্তু সাহিত্য কেমন আনন্দ দেয়, এটা বোঝানোর জন্য তাকে একটা কাব্য পাঠ করতে বললেই ব্যাপারটা মিটে যায় না। সাহিত্যের আনন্দ কখনো হাতে হাতে প্রমাণ করা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে সাহিত্যও এক প্রকার বাজে কথা। বন্ধুতে বন্ধুতে মিলন হলে তাদের মধ্যে অনেক বাজে কথাই হয়। সেই বাজে কথার মধ্যে দিয়ে যে আনন্দ লাভ, হৃদয়ের বিকাশ, বন্ধুপ্রীতি ঘটে, তার মূল্য তো কম নয়। এই আনন্দই তো মানুষকে ‘মানুষ’ রাখে। বাজে কথা ছাড়া হাস্যকৌতুক, প্রেম, আনন্দ—এসব হয় নাকি? এগুলো না থাকলে মানুষের যে কী পরিণতি হতে পারে, সেটা বোঝাবার জন্য টেনে এনেছেন পলিত কেশ বৃদ্ধদের উপমা ঃ “শুষ্ক দেহ, লম্বা মুখ, শীর্ণ গণ্ড, উঁচু হনু, হাস্যহীন শুষ্ক ওষ্ঠাধর, কোটর প্রবিষ্ট চক্ষু—” এমন মানুষেই ভরে যেত সংসার। তারা শুধু পরস্পরকে লক্ষ্য করে “উদ্দেশ্য কঠিন কথার লোষ্ট বর্ষণ” করত। সংসারে, সমাজে বাঁচার আনন্দটুকু আর থাকত না।

রবীন্দ্রনাথ চিরকালের শ্রেষ্ঠ ভাষা শিল্পী। আর সে ভাষায় উপমার ছড়াছড়ি। যে কোনো দুরূহ বক্তব্যকে উপমার সাহায্যে সহজ করে পরিবেশন করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ শিরোনামের ছোট্ট প্রবন্ধটিতেও বেশ কিছু উপযুক্ত উপমার ব্যবহার করে বক্তব্যকে সহজ ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন। উপমাগুলি যে প্রাসঙ্গিক এবং সার্থক, সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

Post a Comment

0 Comments